• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

দেশে প্রথম বারের মত ধনবাড়ীতে বিষমুক্ত সবজি চাষ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৪৭ বার পঠিত
আপডেট : শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১

কৃষিতে ফসল চাষে রাসায়নিক সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বেড়ে চলেছে। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বায়ু দুষিত হচ্ছে। পরিবেশের ও প্রকৃতির উপকারী পোকা মাকড় ধ্বংস হচ্ছে। ফলে পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও জীব বৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

এ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে দেশে প্রথমবারের মত পরিবেশ সম্মত বিষমুক্ত সবজি চাষ হচ্ছে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি গ্রামে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আইপিএম প্রকল্পের আওতায় মডেল প্রকল্প হিসেবে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ করছে। এ প্রকল্পের আওতায় এ মডেল ইউনিয়নে রবি ও খরিপ মৌসুমে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষে রয়েছে ২০টি দল। প্রতিটি দলে ৫ জন নরীসহ ২৫ জন করে রয়েছে সদস্য। ২০টি দলে মোট ৫০০ জন কৃষক নিরাপদ সবজি চাষে ঝুঁকেছে।

সরজমিনে মুশুদ্দি ইউনিয়নে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলে এ বিষমুক্ত সবজি চাষে নানা সফলতার কথা জানা যায়। এক সময় তারা ধান ও সবজি চাষে রাসায়নিক সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করত। ফলে ফসল চাষে খরচ বেশি হতো। অধিক লাভের আশায় তারা বিভিন্ন ধরনের সার বিষ কীটনাশক ব্যবহার করতো। এসব ফসলে বিষ প্রয়োগ ক্ষতিকর জেনেও তারা দিন দিন ফসল চাষ চালিয়ে যাচ্ছিল। রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োগে জনস্বাস্থ্য ও প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতির কথা মাথায় নেননি।

আরও পড়ুন: শিবগঞ্জে ভূঁয়া সিআইডি অফিসার গ্রেফতার

সম্প্রতি রবি মৌসুমের আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশে ১০টি মডেল ইউনিয়নে আইপিএম প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি ইউনিয়নকে গ্রহণ করে। জৈব কৃষি ও জৈবিক বালাইদমন, ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ফেরোমন ফাঁদ স্টিকিটাপ বা হলুদ আঠালো ফাঁদ পরিবেশ বান্ধব জৈব বালাইনাশক পদ্ধতিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পে সুযোগ পেয়ে ৫০০ জন নারী পুরুষ কৃষক প্রশিক্ষণ নিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিষমুক্ত সবজি ইতিমধ্যে উপজেলা জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকায়ও সুনাম কুড়াচ্ছে। ২টি মৌসুমে প্রশিক্ষিত কৃষকরা রবি মৌসুমে করলা, চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, খরিপ মৌসুমে পটল, ধুন্ধল, লাউ চাষ করছে। রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতা পেয়ে কৃষকদের মুখে হাসি দেখা দিয়েছে।

মুশুদ্দি উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক আ: রাজ্জাক (৪৫) জানান, তিনি জৈবিক উপায়ে ৩৫ শতাংশে করলা, ২০ শতাংশে চিচিঙ্গা, ২০ শতাংশে পটল, ২০ শতাংশে চালকুমড়া চাষ করেছেন। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে এবং রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবিক উপায় অবলম্বন করেছেন। আগে সবজি চাষে কীটনাশক ও বিষ ব্যবহার করা হতো। কৃষি বিভাগ থেকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন। এতে তার খরচ অনেকটা কমে এসেছে।

মুশুদ্দি কামারপাড়া গ্রামের সোহরাব আলী (৬৫) জানালেন ২০ শতাংশ জমিতে করলা, ১০ শতাংশে পটল চাষ করেছেন। তিনি আগে এ চাষ পদ্ধতি জানতেন না। এবার তিনি বিষের পরিবর্তে সেক্স ফেরোমন ও আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করছেন। সারের পরিবর্তে জৈব ও কেঁচো সার ব্যবহার করে ফলন ও দাম ভাল পেয়েছেন।

আরও পড়ুন: রাণীনগরে মাসব্যাপী সাঁতার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সমাপ্ত

মুশুদ্দি মধ্যপাড়া গ্রামে মিজানুর রহমান শিবলী (৫৫) ও ঝোপনা পূর্বপাড়া গ্রামের আকাব্বর আলী জানান, বিষমুক্ত সবজি চাষে তারা খুব খুশি। তবে তাদের জৈবিক উপায়ে বিষমুক্ত সবজির ন্যাযদাম ও আলাদা বাজার স্থাপনের দাবি জানান।
খন্দকার পাড়ার সোলায়মান ও মুশুদ্দি উত্তরপাড়ার মুহাম্মদ আলী তাদের উৎপাদিত পরিবেশ সম্মত সবজি প্যাকিং করে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করার দাবি জানিয়ে বলেন, ধনবাড়ী এলাকার বিষমুক্ত সবজি চাষীদের জন্য হিমাগার স্থাপন করলে তাদের মান সম্মত সবজি সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে তারা সবজির ন্যাযমূল্য পাবেন।

ঝোপনা পূর্বপাড়ার মুকুল ও আয়নাল হক জানান কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় উন্নতজাতের উচ্চ ফলনশীল সবজির বীজ, মাঁচার খুঁটি ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ পেয়ে কৃষিতে তাদের অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিষমুক্ত ও জৈবিক উপায়ে সবজি চাষ করতে পেরে তারা আনন্দিত। এ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির দাবি তাদের।

শুধু আ: রাজ্জাক, সোহরাব আলী, মিজানুর, আকাব্বর, সোলায়মান, মুহাম্মদ আলী, মুকুল ও আয়নাল হকই নয় এ রকম ৫শ’ নারী পুরুষ কৃষক একই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছে। মুশুদ্দি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, পটল, চিচিঙ্গা, করলা, কুমড়া খেতে প্লাষ্টিকের বোতল ও হলুদ রংয়ের কার্ড সবজি খেতে উপরে দুলছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় রঙিন কাগজ উড়ছে। সারি সারি সবজি বাগান। সবুজের মনজুড়ানো মাঠ দিগন্তে ফুলে ফুলে শোভাশিত। নানা সবজি ধরে আছে খেতে খেতে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, যে এ এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। স্থানীয় কৃষকরা আরো জানালেন, এ বছর তাদের সবজি পোকায় নষ্ট করতে পারেনি, ফলনও ভাল। তবে রয়েছে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কথা। রয়েছে বিষমুক্ত সবজির আলাদা বাজার স্থাপনের প্রত্যাশা। স্বপ্ন রয়েছে বিদেশের বাজারের তাদের সবজির সুনাম কুড়াবার। রয়েছে হিমাগার স্থাপনের আবদার। তাদের মতে, এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ সব কৃষকের হোক স্বপ্ন সাধ। কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে স্থানীয় কৃষকরা যেমন উৎসাহিত হয়েছে তেমনি সফলতাও পেয়েছে।

এ ব্যাপারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, ফরিদ আহম্মেদ জানান, জৈবিক উপায়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে এ প্রকল্পের কৃষকদের হাতে কলমে শেখানো হয়েছে। কেঁচো সার তৈরি সহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বীজ, মাঁচা, মাঁচার খুঁটি ও নগদ অর্থ প্রদান করেছে। মাঠে গিয়ে তাদের পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে নতুন কৌশলে সবজি চাষ করানো হয়েছে।

ধনবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সারা দেশে ১০টি ইউনিয়নে মডেল হিসেবে কাজ চলছে। তারমধ্যে ধনবাড়ীর মুশুদ্দি ইউনিয়ন ১টি। আমরা নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য থেকে পিছিয়ে আছি। এ চাহিদা পূরণের জন্য এটি একটি উত্তম পন্থা। নিরাপদ খাদ্য মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। সারা দেশে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো বিশেষ প্রয়োজন। ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্ধি ইউনিয়নে ১০০ একরে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি মডেল হিসেবে আবাদ করা হয়েছে। যাতে এটি দেখে অন্যরাও উৎসাহ পায়।

আরও পড়ুন: শিবগঞ্জে ভূঁয়া সিআইডি অফিসার গ্রেফতার

এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে মুশুদ্দি ইউনিয়নকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে এ বছর ১০০ একরে নিরাপদ বিষমুক্ত সবজি চাষ করা হয়েছে। এ প্রকল্প আমি পরিদর্শন করেছি। আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিষমুক্ত নিরাপদ সবজির আবাদ শুধু মুশুদ্দি নয়, সারা দেশে এর বিস্তার ঘটানোর জন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে। কৃষকদের দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাদের দাবি-দাওয়াগুলো আমি অবগত আছি। পর্যায়ক্রমে এ দাবিগুলো পূরণ করা হবে।


এই ধরনের আরও সংবাদ

পুরাতন সব সংবাদ

SatSunMonTueWedThuFri
   1234
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
     12
10111213141516
       
  12345
6789101112
13141516171819
2728293031  
       
  12345
6789101112
13141516171819
2728     
       
      1
16171819202122
23242526272829
3031     
   1234
       
  12345
27282930   
       
29      
       
1234567
2930     
       

বিজ্ঞাপন

error: Content is protected !!