কুষ্টিয়ায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত, দুর্ভোগে ১০ হাজার পরিবার

কুষ্টিয়ায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত, দুর্ভোগে ১০ হাজার পরিবার

:: কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ::

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, পদ্মার পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে কয়েকদিন আগের তুলনায় পানি বৃদ্ধির পরিমাণ বর্তমানে কম। তাদের ধারণা, দু’একদিনের মধ্যে পানি কমতে থাকবে।

এদিকে, হঠাৎ পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের ৩৭ গ্রামের ১০ হাজারেরও বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৩ হাজারেরও বেশি বাড়িঘরের মধ্যে পানি ঢুকেছে। আকষ্মিক বন্যায় চরাঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির মাসকলাইসহ বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। দেরিতে বন্যা হওয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। সেই সাথে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বন্যাকবলিত অসহায় মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ভারতের ফারাক্কা হয়ে পদ্মায় পড়ছে পানি। তবে গত দু’দিন পানি বৃদ্ধির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এখন প্রতিদিন গড়ে ০.১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। দু’দিন আগেও পানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ০.২৪ সেন্টিমিটার। শুক্রবার পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৩.৮৬ সেন্টিমিটার। বিপদসীমা হল ১৪.২৫ সেন্টিমিটার।

বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আকস্মিক পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে আবাদি ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর লোকালয়ের ঘর-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। দু’দিন আগেও যেসব এলাকা শুকনা ও পানিশুন্য ছিল, এখন সেখানে পদ্মার পানি থৈ থৈ করছে। যেদিকে চোখ পড়ে, শুধু পানি আর পানি। চলাচলের সব রাস্তা দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৩৭ গ্রামের প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। নৌকাই তাদের চলার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের সোনাতলা, চরসোনাতলা, চল্লিশপাড়া, সৌদিপাড়া, ঠাকুরপাড়া, চরপাড়া, ইনসাফনগর, চিলমারী, চরচিলমারী, মানিকেরচর, বাংলাবাজার, চরবাহিরমাদী, বাহিরমাদী, ভবনন্দদিয়াড়, আতারপাড়াসহ ৩৭ গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবারের বসতবাড়ি ও ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।

দু’টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ১৪টি প্রাথমিক, ৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ২টি মাদ্রাসা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরাসহ পানিবন্দি সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। উপজেলার রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের চাষ করা আবাদি জমির প্রায় দেড় হাজার হেক্টর মাসকলাইসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। চরাঞ্চলের মাঠগুলো গত এক সপ্তাহ আগেও যেখানে সবুজ ফসলে ভরপুর ছিল। পদ্মার আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে তা তলিয়ে গিয়ে সব জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

সোনাতলা এলাকায় ঘরের ভেতর এক হাঁটু পানির মধ্যে বসবাস করা জয়তুন নেছা নামে এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, দু’দিন ধরে প্রায় না খাওয়া অবস্থায় রয়েছেন। একই অভিযোগ চরসোনাতলা এলাকার জমির উদ্দিন নামে পানিবন্দি এক ব্যক্তির। তিনি জানান, ঘরের মধ্যে হাঁটুপানি। পরিবারের লোকজন নিয়ে খুব কষ্টে আছেন। সেই সাথে পোকামাকড়ের ভয় ও আতঙ্ক রয়েছে। তবে সরকারি বা বেসরকারি কোন সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তাঁরা।

ভাগজোত এলাকার কৃষক কাবিল হোসেন জানান, বন্যার পানিতে তাঁর ৮ বিঘা জমির মাসকলাই ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফিলিপনগর গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান জানান, পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রায় ৪০ বিঘা জমির মাসকলাই পানিতে তলিয়ে গেছে।

রামকৃষ্ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল জানান, ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ২৪টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ২ হাজারেরও বেশি বাড়িঘরের মধ্যে পানি ঢুকে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি জানান, অর্থকরী ফসল মাসকলাই ডুবে কৃষকরা সর্বশান্ত হয়েছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পানিবন্দি মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানান।

দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাইদুর রহমান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য সারওয়ার জাহান বাদশা বলেন, পদ্মা নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে রয়েছেন। প্রতিনিয়ত তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি। এছাড়াও চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সেখানে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়ার কথা জানান সাংসদ। পানিবন্দি হয়ে মানুষ যেন দুর্ভোগে না পড়েন, সে জন্য বন্যা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী রাস্তাঘাটসহ নানা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কথাও উল্লেখ করেন সারওয়ার জাহান বাদশা।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!