নারী শিক্ষা জাগরণের অনন্য এক গ্রাম সাহাপুর

নারী শিক্ষা জাগরণের অনন্য এক গ্রাম সাহাপুর

সাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

গ্রামের নাম সাহাপুর। সাতচল্লিশে সাহারা দেশত্যাগ করলেও শিক্ষা-দীক্ষার ঐতিহ্য সযত্নে লালন করে এসেছেন গ্রামবাসী। ছোট্ট গ্রামটি এখন দেশের নারী শিক্ষায় রোল মডেল হতে যাচ্ছে।

উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে নিভৃত এ জনপদের প্রায় সবাই নিম্ন-মধ্যবিত্ত। প্রাথমিক থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত শিক্ষকতায় রয়েছেন জনা পঞ্চাশেক। নেপথ্যে এরাই নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন।

বর্তমানে গ্রামের ছয় জন মেডিক্যাল কলেজে এবং ১১ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যাালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আর একজন ছেলে পড়েন মেডিক্যালে। গ্রামের মাহমিনা হোসেন মীম ঢাকা মেডিক্যালে, নিলোফা ইয়াসমীন ময়মনসিংহ মেডিক্যালে, সুচিত্রা ধর রাজশাহী মেডিক্যালে, সুরাইয়া সুলতানা প্রমি খুলনা বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে, আঁখি আখতার রংপুর মেডিক্যালে এবং মাহমুদুল হাসান তালুকদার ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পড়াশোনা করেন।

এ গ্রামের ছাকিবুন্নাহার বন্যা ত্রিশাল কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক। এখান থেকেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পান। জান্নাতুল নাহার লিজা ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে চীনে পিএইচডি করছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন আমিনা তালুকদার রিতু। নিশাত তালুকদার ঢাবিতে এবং হোসনে আরা রিংকু, কামরুন্নাহার পাঁপড়ি, জান্নাতুল মেওয়া, তানিয়া ইয়াসমিন তনু এবং সেতু তালুকদারসহ একডজন মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর, খুলনা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। গ্রামের দুই মেয়ে পুলিশে, ১২ জন নার্সিংয়ে এবং ১০ জন স্বাস্থ্য বিভাগসহ সরকারি চাকরিতে রয়েছেন। শিক্ষার হার শতভাগ।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক লুত্ফর রহমান মনির জানান, ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু সাহারা গ্রামে টোল প্রতিষ্ঠা করেন। সেই টোলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করতেন তার মা রোকেয়া খাতুন। বেগম রোকেয়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি গ্রামে দীর্ঘদিন শিক্ষার আলো ছড়ান। সেখান থেকেই নারী শিক্ষার পথযাত্রা। ষাটের দশকে সাহাপুর প্রাইমারি স্কুলটি সরকারি হয়। গ্রামের প্রথম পুরুষ স্কুলশিক্ষক আব্দুর রহিম ছিলেন সকলের অনুসরণীয়।

তাকে অনুসরণ করেই কালক্রমে সাহাপুর শিক্ষকের গ্রামে পরিণত হয়। বর্তমানে ৪৯ জন শিক্ষকতায় নিয়োজিত। গ্রামের প্রাইমারি থেকে হাতেখড়ি নিয়ে মেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুর সাত্তার জানান, রাজনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য, বিদেশ গমন এবং ঘর-গৃহস্থালির প্রতি বাড়তি আগ্রহ ছেলেদের। গৃহিণীরা মেয়েদের যত সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, ছেলেদের ততটা না। এজন্য গ্রামে ছেলেমেয়ে শিক্ষায় বৈষম্য। স্কুলশিক্ষক এম এ মাসুদ বলেন, গ্রামে মেয়ের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। শত বছর ধরে নারী শিক্ষার বাড়তি পরিবেশও রয়েছে। এজন্য মেয়েদের জয়জয়কার।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ বিশ্বাস জানান, সাহাপুর গ্রামের খবর খুবই উত্সাহব্যঞ্জক। নারী শিক্ষার সাফল্য বিবেচনায় গ্রামটি সারাদেশের জন্য রোল মডেল হতে পারে।

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই সুচিত্রার

বাবা সন্তোষ চন্দ্র ধরের স্বপ্ন ছিল মেধাবী সুচিত্রাকে মেডিক্যাল কলেজে পড়াবেন। দারিদ্র্যের কারণে মেয়েকে ভালো স্কুলকলেজে পড়াতে পারেননি। কিন্তু এরপরও সুচিত্রা এবার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছে। সম্প্রতি সন্তোষ চন্দ্র পরলোকগমন করায় স্ত্রী মুক্তি রানি ধর অর্থাভাবে মেয়ের লেখাপড়া চালানো নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায়।

বাড়িভিটে ছাড়া কোনো জমিজমা নেই। ছোট্ট একটি মুরগির খামারের আয়ে দুবেলা খাবার জোটে না। ধারদেনার টাকায় মেডিক্যালে ভর্তির ব্যবস্থা হলেও লেখাপড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ কিভাবে জোটাবেন তা নিয়ে দুর্ভাবনায় মা মুক্তি রানি।

তিনি সুচিত্রার লেখাপড়ার সুব্যবস্থার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!