বিষ্ণু সরকার পথিকের – সোনাই

বিষ্ণু সরকার পথিকের – সোনাই

বিষ্ণু সরকার পথিক

সোনাই

:: বিষ্ণু সরকার পথিক ::

বারেক আর মতি, মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে বাড়ির দিকে আসছিল।আর এদিকে আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে আছে! মতির মা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে বলছিল-

“আয় আয় চই,চই,চই” বিরক্ত সহিত গালি দিতে লাগল,” কুত্তার বাচ্চারা জ্বালায়া খাইল! বেইচা দিমু সামনের হাটেই, তহন দিহুমনি কি রহম করতে পারস!বটির নিচে যাইতে অব!”

মতি পুকুর পাড়ে না দাঁড়িয়ে সোজা বাড়িতে চলে গেল।

মিলি বলে উঠল,”ভাই, হাত-মুখ ধোও,আমি খাওন দিচ্ছি!” মতি ঘাসের বোঝা নামিয়ে, কলপাড়ে গেল।
বলতে লাগল,” বারেকের আব্বা না, বিশাল বড় গরু কিনছে! আইজ আমার লগে ঘাস তুলল বারেক!”

মিলি বলে উঠল,” আমাগোর সোনাইরে বালা দেহা যায় না ওগোরডা?”

আমি তো এহনো দেহিনাই আফা।কাইল একবার যামু!

মতির কথা শেষ না হতেই, মতির মা মমতা বলতে লাগল,” যা খাইয়া পড়তে বহ!”

মায়ের কথামত নিভু- নিভু আলোয় ঢুলে ঢুলে পড়তে লাগল।

ক্লাশ থ্রিতে পড়ে মতি।মিলি ক্লাশ এইট পর্যন্ত পড়ে বাদ দিয়েছে! মমতা ধানভানার কাজ করে।বাড়ির সকল কাজের দেখভাল করে মিলি।

কিছু দিন আগেও ধর্মপাশা গ্রাম থেকে দেখতে আসছিল।ছেলে নাইন পাশ। স্কুলের দপ্তরি। মায়ের ছেলে পছন্দ হয়েছিল কিন্তুু দেনা-পাওনার দাবি বেশি থাকায়, দেখা অবধিই গড়ায়।তবে মিলির মা এখনও বিয়েটা টিকাতে চেষ্টা করছে।

পাশের বাড়ি কাশেম মেম্বার লোকটা খুবই সহজ-সরল। সবার বিপদ আপদে এগিয়ে আসে! বিয়ের বেপারে মিলির মা তার সাথে প্রতিনিয়তই কথা বলে।ছেলে ভালো, এ ছেলে হাত ছাড়া করা যাবে না। তার টাকাটা জোগাড় করতেই হবে। অনেক হিসেব কষে সমাধান একটাই সোনাইকে বিক্রি করতে হবে! বিক্রি করার কথা শুনে মিলি অভিমান করে বসে আছে। আজ সারাদিনে বাড়ির একটা কাজও করে নাই। পড়ন্ত বিকেলের দিকে মমতা বাড়ি ফিরে- সবই বুঝতে পারলেন। কি আর করবি মা,তোর বাপ বাঁইচা থাকলে! আমার এসব নিয়ে চিন্তা করতে হইতো?

ছেলে ভালো, ও বাড়িতে গেলে সুখেই থাকবি! তোগর মন বুঝি কিন্তু কিছু করার নাই মা।কত্ত আদরের সোনাই আমাগোর! মায়ের কথা শেষ না হতে, কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,”মা এহন আমারে বিয়ে দিতে অইবো না! সোনাই ক দিন পর বাঁচ্চা দিব।আমরা দুধ বেঁইচা টাকা জোগাড় করমু মা!”

মারে তুই বুঝার চেষ্টা কর,ছেলের বাড়ি সবাই তোরে পছন্দ করছে।কাইল আমি আবার খবর দিয়া পাঠাইছি। জানতে পারছি তারা পরশু দিন আবো আর দিনক্ষণ ঠিক করব।

মা তুই অমত করিসা না, লক্ষ্মীটি!

মিলি কোন কথা না বলে, সোনাইকে খড়- ভূষি দিতে গেল।

আর ও দিকে মতি, ঘাসের বোঝা মাথায় থেকে নামিয়ে ছুড়ে মারলো,সারা শরীরের শক্তি প্রয়োগ করে। ঘাসগুলো এলোপাতাড়ি উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল।

বলতে লাগলো ” মা, আমি কি হুনতাছি! সোনাইরে নাকি বেঁইচা দিবা? বারেক আমারে কইলো। আবার হুনলাম কাইল গরুর বেপারি আবো! কথা কও না ক্যা?

মা বলে উঠে, হ বাপ যা হুনছস সব হাছা কথা। দেখ বাপ কাছে আয়, আমার কাছে আইয়া বহ। তরে বুঝাই, তুই বুঝবি।

মতি, মায়ের কথা মত কাছে গিয়ে বসলো।

মতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, মাথা নাড়িয়ে না করল।

মা বলে উঠলো,” তাইলে বাপ সব মাইনা নে।আমাগোর সোনাইও বালা থাকব।যারা কিনব তারা দহিন পাড়ায় থাকে। মাঝে-মাঝে তুই দেইখা আইবার পারবি! মায়ের কথাগুলো শুনে, কথা না বলে কল পাড়ের দিকে গেল।

ওদিকে মিলি চুলে তেল দিচ্ছিল।সামনেই ছিল দোয়াত।মৃদু-মৃদু জ্বলছিল।ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে, আলো সোনাই এর গায়ে এসে পড়ছে!

মা রান্না ঘর থেকে, অপলক চোখে, মিলির দিকে চেয়ে আছে।

মতি ঘরে ঢুকতেই, মিলি বলে উঠে, “ভাই, তুইও কি চাস,সোনাইরে বেঁইচা দিক?”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে উঠে, “আফা, মা কি করব কও!বাপে মইরা গেছে,বালা কইরা চেহারাও মনে করবার পারিনা! ছোট থেইকা দেখতাছি, মা কত্ত কষ্ট করতাছে! মায়ের কথা মাইনা নাও।”

ভাই তুইও তাইলে মায়ের পক্ষ নিয়া কইতাছস?

আফা রাগ করো ক্যা! পোলা বালা, মা কইলো।তুমি সুখে থাকবা।সোনাই এর কথা কইতাছো না! আমারও পত্তম খারাপ লাগছে।মা যহন বুঝাইলো, সব বুইঝা নিছি।কিচ্ছু করার নাই আফা! আমরা গরিব, টেহা দরকার। বিয়ার মেলা খরচ।সবচেয়ে খারাপ লাগব কি জানো আফা! সোনাইরে আর দেহুম না, সোনাই আর হাম্বা কইরা ডাকবো না!

কথাগুলো বলেই দুজনে কান্না করছে। আর মায়ের পাষাণহৃদয়, চুপ করে বাইরে বসে রান্না করছে।

সত্যিই কি তাই? প্রশ্ন রইল মমতার মত স্বামী হারা মায়েদের কাছে!

মধ্যরাত, চুপিসারে মিলি দরজা খুলে সোনাই এর কাছে গেল।

সোনাইও আজ কেমন যেন চঞ্চল,মিলি হাত দিতেই সোনাই উঠে দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে মিলি কান্না জড়িত কন্ঠে বলতে লাগল,” সোনাইরে,মাপ কইরা দিস বইন আমার। আমি যদি জানতাম, আমার বিয়ার লাইগা তোরে বেঁইচা দিতে অইবো!

তাইলে তোরে এত্ত আদর করতাম না। তোরে আমাগোর পরিবারের সদস্য বানাইছিলাম।আইজ তুই আমার বাপের কাজ করতাছস!

এদিকে সোনাইও চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে।অসহায়, অবলা প্রাণী তবুও মনে হচ্ছে কত কিছুই বুঝে। নিরবতার চাঁদরে ছেঁয়ে আছে সোনাই এর ঘরটা।মিলি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে চলে আসল।

পরদিন সকালে ন্যায্য দাম দিয়ে বেপারি সোনাইকে নিয়ে গেল। দুমাস হয়ে গেছে , মিলি শ্বশুর বাড়ি।বিয়ের পর আর একটি বারও আসেনি।

মতি আগের মতই প্রতিদিন স্কুলে যায়।সন্ধ্যায় মায়ের কাছে বসে,দোয়াতের নিভু নিভু আলোয় ঢুলে ঢুলে পড়ে।

হঠাৎ পড়া বন্ধ করে বলে উঠলো,” আফারে আর সোনাইরে কত্ত দিন ধইরা দেহিনা মা! চলো না মা দেখবার যাই।”

তোর আফা আর কোন দিন আবো না।সোনাই এর সাথে মিলিও চইলা গেছে! কত্ত খবর পাঠাইলাম, তবুও একবারও আইলো না! কি পাষাণ মাইয়া!

মা আমি একবার, সোনাইরে দেখবার যামু! মায়ের অনুমিত নিয়ে মতি পরদিন স্কুল শেষে, দহিন পাড়ায় যায়।অনেক চেষ্টার পর বাড়ি খুঁজে পায়।

গিয়ে দেখে সোনাই এর গায়ের রং এ হুবুহু ছোট্ট বকনা বাছুর।

জিজ্ঞেস করলেন মতি,” সোনাইরে কই রাখছেন?”

সোনাই নামে কেও থাকে না এখানে,উত্তর পায় মতি।পরে বুঝিয়ে বলার পর বাড়ির লোকেরা বুঝতে পারে। তারা বলে, “ঐ যে বাছুরডা দেখতাছো না!ঐডাই তোমাগোর সোনাইয়ের বাছুর। কদিন ধইরা ঠান্ডায় ভুগলো।ঠিক মত খাইনা। শুকাইয়া গেলগা। পরে পাঁচ কি ছয় দিন অব সোনাইরে জবাই করছি।” কথাটা শুনার পর মতির ছোট্ট হৃদয়ে কষ্টের নদীর স্রোত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

কোন কথা না বলে, দৌঁড়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। দুচোখে বেদনা ও কষ্টের না বলা কথা গুলো আজ সোনাইকে ঘিরেই আছে!

কারন সোনাই এর গলার দড়ি ঝুলছিল, আম গাছের ডালে।মৃদু বাতাসে নড়ছিল, আম গাছ ঘিরে পিপীলিকাদের আনাগোনা। মনে হচ্ছে,কান¬পাতলেই শোনা যাবে ক্ষুদার্ত রক্তপিপাসুদের চিৎকার আর কত আয়োজন সোনাইকে ঘিরে!

বাপ আমার তোর বাপ বাঁইচা থাকলে আমার এত কষ্ট করতে হইতো! মাইয়া মানুষ হইয়া, ধানের মিলে ধান ভানার কাজ করি! তোগরে কষ্ট কইরা বড় করছি।তোর আফার বিয়ের বয়স হয়ছে। আইজ হোক কাইল হোক বিয়া ঠিকই দিতে অইব। ছেলে বালা, বিয়া হইলে তোর আফা সুখেই থাকব।বড় পরিবার, আমরা গরিব তবুও মিলিরে দেইখা পছন্দ করছে।

রাগ যে করতাছস, তুই কি চাস তোর বোনের বিয়া ভাইঙা যাইক!

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!