সিনেমার রঙিন দুনিয়া এখন ফ্যাকাসে

সিনেমার রঙিন দুনিয়া এখন ফ্যাকাসে

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নায়িকা নুসরাত ফারিয়া।

:: বিনোদন প্রতিবেদক ::

অন্যান্য খাতের মতো বিনোদনশিল্প- সিনেমা জগতেও পড়েছে করোনার প্রভাব। এ ভাইরাসের কারণে চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়া এখন হয়ে উঠেছে অনেকটাই ফ্যাঁকাসে। প্রায় তিন মাস ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সব ধরনের কর্মকা- বন্ধ রয়েছে। শুটিং হচ্ছে না, নতুন সিনেমার মুক্তি নেই, প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ। জুনের ৫ তারিখ থেকে একজন পরিচালক শুটিং করতে শুরু করলেও অন্যরা এখনো কাজ শুরু করেননি। নায়ক-নায়িকারাও এই পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে আগ্রহী নন। জানা গেছে, শীর্ষ নায়ক-নায়িকারা জানিয়ে দিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা শুটিং করবেন না।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নায়িকা নুসরাত ফারিয়া। মার্চে তার পাঁচটি চলচ্চিত্রের কাজ চলছিল। কিন্তু বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সেগুলোর সবই এখন বন্ধ হয়ে রয়েছে।

নায়িকা নুসরাত ফারিয়া বলেন, ‘এখন বলা যেতে পারে মার্চের ১১ তারিখ থেকে একেবারেই আমি ঘরে বসে রয়েছি। কারণ তখন থেকেই কলকাতার ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। এখন কলকাতায় স্বল্প পরিসরে শুটিং শুরু হয়েছে, বাংলাদেশেও কয়েকটি জায়গায় শুটিং হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বল্প পরিসরে শুটিং করাটা আসলে কতটুকু নিরাপদ? এবং এভাবে সীমিতভাবে অল্প টাকায়, কম টেকনিশিয়ান ও আর্টিস্টকে দিয়ে কাজ করে কি আসলে সেই একই রকম কোয়ালিটি প্রডাক্ট পাওয়া সম্ভব? এত বাধা যখন চলে আসে, তখন একটাই সমাধান যে এখন কাজ না করা।’

চলচ্চিত্রের শুটিং করার সময় নায়ক-নায়িকাদের অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বা কাছাকাছি দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়। কিন্তু এখন সামাজিক দূরত্বেও যে কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে সেসব দৃশ্যে অভিনয় করা কতটা সম্ভব?

মাহিয়া মাহি বলেন, ‘হয়তো প্রযুক্তি, ক্লোজআপ শট ইত্যাদি ব্যবহার করে কাছাকাছি না গিয়েও সে রকম দৃশ্য তৈরি করা যাবে, কিন্তু তাতে কি সেই মানসম্পন্ন ফলাফল পাওয়া যাবে? পুরোপুরিভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত শুটিং শুরু করা কতটা ঠিক হবে, আমার জানা নেই। কিন্তু এর ফলে একটা অনিরাপত্তাবোধ, এটা উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে বলে মনে হয়।

ক্ষতির মুখে শতশত কোটি টাকা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে বছরে ৬০টির বেশি সিনেমা মুক্তি পায়। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে এর মধ্যেই সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। আগে মাসে পাঁচ-ছয়টি সিনেমা মুক্তি পেত। বছরে প্রায় ৫০টির মতো সিনেমা মুক্তি পেত। কিন্তু ১৮ মার্চের পর থেকে শুরু করে জুন মাস শেষ হতে চলল, এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। পুরো বিনোদনশিল্পই এক প্রকার স্থবির হয়ে রয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে সিনেমার শুটিং বন্ধ কওে দেয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি। ৫ জুন থেকে শুটিং চালুর অনুমতি দেওয়া হলেও শুধু একটি সিনেমার শুটিং হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘আমাদের শিল্পটি তিনটি স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমটি হলো যারা জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চে সবেমাত্র ছবি মুক্তি দিয়েছিলেন। সেগুলো চলা বন্ধ হয়ে গেল। কিছু শুটিং চলছিল, সেগুলো মাঝপথে আটকে গেল। অনেকের সেন্সর করে মুক্তির অপেক্ষা করছিলেন, তাদের টাকাও আটকে গেল। সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে নববর্ষে আর ঈদে নতুন ছবি মুক্তি দিতে না পারায়। সারাবছর ছবি মুক্তি দিয়ে আসলে আমাদেরও তেমন কোনো সুবিধা হয় না। কিন্তু যে কয়েকটি বড় উৎসবের ওপর সারাবছর আমরা বেঁচে থাকি। যেমন নববর্ষ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা। দুটি উৎসব চলে গেল, ঈদুল আজহায় কী হবে, সেটাও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘কারও হাতে কাজ নেই। কোনো প্রযোজক বিনিয়োগ করছেন না। যেসব ছবি শুরু হয়েছিল, সেগুলো বন্ধ হয়ে আছে। ফলে এক কথায় বলা যায়, কোনো পরিচালক এখন আর ভালো নেই। সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তারা আবার শুটিং শুরু করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পুরোপুরি শুরু করা যায়নি। টুকটাক ডাবিং, এডিটিং এসব হচ্ছে। শুটিং শুরু হতে ঈদুল আজহা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মনে করছেন। তার পরও তা ঠিকমতো শুরু হবে কিনা, সেটি নির্ভর করছে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি কী হবে, তার ওপর। এর মধ্যেই ১০০টি সিনেমা নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছেন প্রযোজকরা। কষ্টে থাকা চলচ্চিত্রকর্মীদের সাহায্যে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেলেও প্রণোদনার ব্যাপাওে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সিনেমা হল খোলা হলে পুরনো ভালো ছবি নতুন করে চালানোর কথা ভাবছে প্রযোজক সমিতি।’

শঙ্কায় হল মালিকরা

ফেব্রুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশে ৮৮টি সিনেমা হল চালু ছিল। কিন্তু নতুন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এর কতগুলোকে আবার চালু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে। মধুমিতার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই আমাদের সিনেমা হলগুলো সংকটে ভুগছে। কারণ ভালো ছবি নেই, ফলে সিনেমা হলগুলোর সংখ্যা কমতে কমতে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০, সেখান থেকে ৩০০, এখন ১০০তে এসে ঠেকেছে। আসলে চালু আছে ৮৮টি। তার পরও কনটেন্টের অভাবে ব্যবসা করার মতো সিনেমা পাওয়া যায় না, ব্যবসা হয় না। এখন করোনা এসে সেই কফিনে লাস্ট পেরেক ঠুকে দিয়েছে। পরিস্থিতি যদি ভালোও হয়, তা হলেও সিনেমা হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল চালু রাখাÑ এসব কারণে আমার মনে হয় অনেক হল খুলবেই না। এসব নিয়ম মানতে হলে যেসব বাড়তি খরচ হবে, অনেক মালিক সেটা বহন করতে পারবেন না। ফলে আপাতত আমাদের সিনেমা হল খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। এভাবে চলতে থাকলে এখন যে ৮৮টি সিনেমা হল চালু আছে, তার ৩০-৪০টি একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।’

সারাবছর ছবি মুক্তি দিয়ে আসলে আমাদের তেমন কোনো সুবিধা হয় না। কিন্তু যে কয়েকটি বড় উৎসবের ওপর সারাবছর আমরা বেঁচে থাকি যেমন নববর্ষ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা। দুটি উৎসব চলে গেল, ঈদুল আজহায় কী হবে, সেটাও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

One response to “সিনেমার রঙিন দুনিয়া এখন ফ্যাকাসে”

  1. […] আইন পাস হলে তীব্র আন্দোলন : রিজভী সিনেমার রঙিন দুনিয়া এখন ফ্যাকাসে বাংলাদেশে চাকরি প্রত্যাশীদের সামনে […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!