মধুপুরে করোনা যুদ্ধে এক পরিবারের সাত ডাক্তার

মধুপুরে করোনা যুদ্ধে এক পরিবারের সাত ডাক্তার

:: মধুপুর প্রতিনিধি ::

আমারা যখন অসুস্থ্য হই, ধনী কিংবা গরিব যাই হই না কেন তখন সবাই থাকি অসহায়। অসহায়ত্বের এই কঠিন সময়ে থাকে মানুষের বাঁচার আর্তনাদ, থাকে আকুল-আকুতি। আর চরম অসহায় এই মানুষদের সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন একজন ডাক্তার । মেডিকেল এথিক্স এবং মেডিকেল এটিকেট যার উদ্দেশ্য শুধুই রোগীর সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর সাথে চিকিৎসকের পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস, ভরসা এবং রোগীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে দেওয়া।

একাত্তর সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধ, তখন ছিল সারা দেশে আতঙ্ক এবং অবরুদ্ধ । স্বার্বক্ষনিক ভয় ছিল হামলার, কারফিউ ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের। ঠিক আবার ৪৯ বছর পর সেই মার্চ মাস থেকেই বাংলাদেশ এখন অনেকাংশে অবরুদ্ধ। এবার আতঙ্ক মানুষ খেকো বিশ্ব প্রাণঘাতী এক করোনাভাইরাস । আর এবারের যে যুদ্ধাবস্থা, সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার নয়, জীবন বাঁচানোর। জীবন বাঁচানোর এই যুদ্ধের শেষ ভরসা ডাক্তাররা।

জীবনের মায়া না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা খ্যাত ডাক্তারা। এফডিএসআর’র হিসাব অনুযায়ী অদ্যবদি (২৫ জুন দেশ রূপান্তর প্রত্রিকায় প্রকাশিত), করোনায় এখন পর্যন্ত ৫০ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ৮ চিকিৎসক। দেশের এই ক্রান্তিকালে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসাবে কাজ করছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের এক পরিবারের ৭ জন ডাক্তার, যা মধুপুরের জন্য অত্যান্ত গর্বের ও সারাদেশে বিরল।

তাদের সবার পরিচয় তুলে ধরা হলো-

মধুপুরের হিন্দু পরিবার অনিল কুমার চৌধুরীর ৪ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে ২ ছেলে ডাক্তার। তারা হলেন ডাঃ জহুরুলাল চৌধুরী ও ডাঃ দুলাল চৌধুরী। তাদের বড় ভাই আখিমল চৌধুরীর মেয়ে ডাঃ তপতী চৌধুরী এবং ছেলে তন্ময় চৌধুরীর সহধর্মিণী ডাক্তার রুপা সাহা ।

ডাঃ জহুরুলাল চৌধুরীর ১ মেয়ে সমাপ্তি চৌধুরী। সমাপ্তি চৌধুরী ডাক্তার হিসাবে ইন্ডিয়াতে কর্মরত আছেন এবং ডাঃ দুলাল চৌধুরীর মেয়ে ডাঃ সুপ্তা চৌধুরী এবং মেয়ের জামাই ডাঃ দেবাশীষ রায় ।

ডাঃ জহুরুলাল চৌধুরী

১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে কয়েক বছর সরকারি চাকরি করেন। তারপর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে প্রথমে মুক্তাগাছা ও পরে মধুপুর প্রাইভেট প্রেকটিস শুরু করেন। পরবর্তীতে মধুপুরেই গড়ে তোলেন চৌধুরী আউটডোর ক্লিনিক ও হাসপাতাল। তিনি করোনার এই দুঃসময়েও প্রতিদিন রোগী দেখছেন।

ডাঃ দুলাল চৌধুরী

১৯৭২ সালে মধুপুর রানীভবাণী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বারের মতো ষ্টার মার্কস পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় বাবু মহেন্দ্র লাল বর্ম্মন নিজ বাসায় এসে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন যা তার স্মৃতিতে আজও অম্লান। ১৯৭৪ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১ম বিভাগে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। (মোট ২ জন ১ম বিভাগ সারা আনন্দ মোহন কলেজে)। ১৯৮২ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ১৯৮৩ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালে ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে বিসিএস (স্বাস্হ্য) ক্যাডারে যোগদান করেন।দীর্ঘ কর্ম জীবনে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরেও চাকুরী করেছেন।

মধুপুর হাসপাতালে ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মেডিকেল অফিসার এবং পরবর্তীতে আর,এম,ও হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সিভিল সার্জন হিসেবে ৪ বছর নারায়ণগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। চাকুরীরত অবস্থায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা সফর করেন এবং ওখানকার কিছু স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রম বাংলাদেশে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। ডাঃ দুলাল চৌধুরী সর্বশেষ ২০১৬ সালে ডেপুটি ডাইরেক্টর স্বাস্হ্য অধিদপ্তর, মহাখালী ঢাকা থেকে অবসর গ্রহন করেন।

অবসরের পর সিলেটে উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসাবে এবং বাংলাদেশ সরকারের মেটারনাল এন্ড নিওনেটাল কেয়ার প্রকল্পের কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত৷ তবে সময় পেলে মধুপুর চৌধুরী ক্লিনিকে রোগী দেখেন। অবসর গ্রহণের পর থেকে তিনি বিভিন্ন প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত৷ তবে সময় পেলে মধুপুর চৌধুরী ক্লিনিকে রোগী দেখেন।

আখিমল চৌধুরীর মেয়ে ডাঃ তপতী চৌধুরী ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন উপজেলার উপজেলা স্বাস্হ্য কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত আছেন। তার ভাইয়ের (তন্ময় চৌধুরীর) বৌ ডাক্তার রুপা সাহা ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন।

ডাঃ দুলাল চৌধুরীর মেয়ে ডাঃ সুপ্তা চৌধুরী এমবিবিএস, এমপিএইচ (বিএসএমএমইউ) বর্তমানে স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টি সেবার ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (হট লাইন) হিসাবে কর্মরত আছেন। তার বর ডাঃ দেবাশীষ রায় বর্তমানে ঢাকায় মুগদা সরকারি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মুঠো ফোনে ডাঃ জহুরুলাল চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, একজন ডাক্তারের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সেবা দেওয়া। এই সেবার মাধ্যমে যেমনি মানুষের খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়, তেমনি প্রতিটি সফল কাজের জন্য আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়।তিনি করোনাকালীন সময়ে কর্মরত ফ্রন্টলাইনে থেকে যারা কাজ করছেন তাদের সবার উপযুক্ত মানের পিপিইর জরুরী প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেন।

ডাঃ দুলাল চৌধুরী জানান, করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে। অনেক মানুষ কোনো উপসর্গ ছাড়াই বিভিন্ন হাসপাতালে হাজির হচ্ছেন। ফলে, ডাক্তারা সর্বত্র ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে কাজ করছে। সবাই উদ্বিগ্ন । তিনি আরো বলেন, শুধু আমরাই ঝুঁকিতে আছি তা কিন্তু নয়, জনগণও ঝুঁকিতে, আমরা নিরাপদ না থাকলে তারাও তো নিরাপদ থাকতে পারবেনা।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!