সম্ভাবনার কৃষি- মধুপুর গড়ে একজমিতে একইসাথে ৬ কৃষি ফসল

সম্ভাবনার কৃষি- মধুপুর গড়ে একজমিতে একইসাথে ৬ কৃষি ফসল

নিজস্ব প্রতিবেদক- মধুপুর

এক জমিতে এক ফসল চাষ। ধানের সময় ধান। পাটের সময় পাট চাষ। এটাই কৃষি ফসল ফলানোর চিরায়ত নিয়ম। এভাবে চলে আসছে আদি কাল থেকে। এক জমিতে এক সাথে দু-তিন ফসল এটাও স্বাভাবিক । তবে মধুপুর গড় এলাকায় এক সাথে এক জমিতে দু’তিন ফসল নয়, এক সাথে ৪ থেকে ৬ টি সাথী ফসল চাষ করছে কৃষকরা।

এ নিয়ে কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুঁজে পেয়েছে গড় এলাকার প্রান্তিক কৃষকরা। লালমাটির উচু এলাকা বন্যামুক্ত হওয়ায় কৃষকরা অল্প খরচে অল্প সময়ে অধিক সাথী ফসল চাষে নেমে পড়ায় কৃষিতে দেখা দিয়েছে অপার সম্ভাবনা।

এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন। কৃষি প্রধান দেশ হিসাবে বাংলাদেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। কৃষকরা তাদের কাক্সিখত ফলন ও লাভ দুটাই পাবে এমনটাই ভাবছেন গড় এলাকার কৃষকরা।

মধুপুর গড় এলাকার পিরোজপুর, সাইনামারী, পীরগাছা, ধরাটি গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন প্রতিযোগিতার যুগ। কৃষি জমির পরিমাণ দিনদিন কমছে। পারিবারিকভাবে জমি বন্টনে বাপ দাদার ওয়ারিশ হিসেবে ভাগে জমি কমে যাচ্ছে। কিভাবে অল্প খরচে, অল্প জমিতে, অল্প সময়ে অধিক ফসল পাওয়া যাবে এ চিন্তা থেকে গড় এলাকার কৃষকরা একসাথে এক জমিতে ২-৬ টি পর্যন্ত সাথী ফসল চাষে ঝুকেছে। কৃষকরা জানালেন, বন্যার পানি উঠেনা এমন উচু জমিতে এ চাষ পদ্ধতি করা সম্ভব। বন্যামুক্ত উচু উর্বর মাটিতে এ পদ্ধতিতে চাষ করলে কৃষকরা সফল হবে বলে তারা জানান। মধুপুর গড় এলাকার পিরোজপুর, চাপাইদ, অরণখোলা, সাইনামারী, ভুটিয়া, মমিনপুর, ধরাটি, পীরগাছা, ফুলবাগচালা, কালিয়াকুড়ি, শোলাকুড়ি, কাকড়াগুনি, জয়নাগাছা, চুনিয়া, বেদুরিয়া, গায়রা, টেলকি, হরিণধরা, আমলিতলা, বেরীবাইদ, মাগন্তীনগরসহ বিভিন্ন গ্রামে এ পদ্ধতির চাষ দেখা যায়। এ পদ্ধতি আনারস চাষের সাথে বেশী করা হচ্ছে। আদা, পেঁপে, কচু চাষেও করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার ফলে অল্প সময়ে কৃষকরা বেশি লাভবান হচ্ছে। দিনদিন বাড়ছে সাথী ফসলের এ পদ্ধতির চাষ।

সরেজমিনে কুড়াগাছা ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রমে গিয়ে আজিজুল হকের এ পদ্ধতি দেখতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি ৫ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেছেন এ পদ্ধতির বাগান। সুন্দর করে সাথী ফসলের স্বল্প সময়ে সাজিয়েছেন তার বাগান। তার বাড়ির পালানে ৫ বিঘা জমির বাগানে ১৮ হাজার আনারসের চারা লাগিয়েছেন। সাথে ৪শ’৬০ টি দেশী লেবুর চারা, আদা, কচু, ১২শ’ পেপে, ২শ’ কলা ও দেশী মরিচের চারা লাগিয়েছেন। এক সাথে ৬ টি ফসল সমান তালে বেড়ে উঠছে। আনারসের গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে এসব সাথী ফসল লাগিয়েছেন। পেপে গাছে প্রচুর পরিমাণে পেপে ধরেছে।

আদা, কচুও ভালো হয়েছে। লেবু গাছও বেড়ে উঠে লেবু ধরতে শুরু করেছে। মরিচ নিজেদের খাওয়ার পর কিছু বিক্রিও করেছেন। বর্ষার কারণে মরিচ গাছ এখন শেষ হয়েছে। তার এ ৬ ফসল একসাথে চাষ প্রসঙ্গে আজিজুল হক (৫০) জানান, তার জমির পরিমাণ কম। কিভাবে লাভবান হওয়া যাবে এ চিন্তাধারা থেকে এ চাষ শুরু। তার মূল ফসল হল লেবু। লেবু ১২ মাসী।

প্রায় ১ যুগ রাখা যাবে। লেবুর সাথে আর কি ফসল ভালো হয় এজন্যে তিনি আনারস লাগান। আনারসের সাথে অল্প সময়ে আর কি চাষ করা যায় এ জন্য তিনি ১ বছরের ফসল পেঁপে লাগান। সাথে ৬ মাসের ফসল আদা ও কচু লাগান। সাথে পাতলা করে কিছু কলা গাছ লাগান। তারপর নিজের খাওয়ার জন্য কিছু মরিচ লাগান। মরিচও ৩/৪ মাসের ফসল। তার মতে মরিচ নিজেদের খাওয়ার পর সামান্য বিক্রি করেছে। ৬ মাসে আদা কচু তুলে বিক্রি করেছেন। এক বছরের মধ্যে পেঁপে বিক্রি শেষ হবে। ২-৩ বছরের মধ্যে আনারস বিক্রিও শেষ হবে। শেষে থাকবে মূল ফসল লেবু। তিনি আরোও জানান, আদা, কচু,পেঁপে,আনারস, কলা সব মিলিয়ে কয়েক লক্ষ টাকার বিক্রি করতে পারবেন এমনটাই আশা করছেন তিনি।

তিনি আরোও জানান, প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রী বলেছেন একটু জায়গাও পতিত রাখা যাবেনা। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উন্নতি হলে দেশের উন্নতি হবে। এ চাষে দেশের ও নিজের উন্নতি হবে। নিজের বাগানে উৎপাদিত ফসল খেয়ে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। পাওয়া যাবে। অল্প খরচে জমিতে অধিক ফসল। এ পদ্ধতি তার খুব ভাল লাগে। সকাল বিকাল বাগানে ঘুরতে তার ভাল লাগে।

এই গ্রামের আরেক কৃষক এছাক আলী (৪৬) তার বাড়ির পালানে এক বিঘা জমিতে সাজিয়েছেন ৪ ফসলের বাগান। এক সাথে লাগিয়েছেন পেঁপে মরিচ আদা ও লেবু। আবু সাইদ (৫০) তার ৪৫ শতাংশ জমিতে একই ভাবে লাগিয়েছেন কলা, পেঁপে, আদা, কচু, ডাটা ও পুঁইশাক লাগিয়েছিলেন। সুমন মৃধা (৩৬), তিনি তার বাড়ির পাশে ২০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন বাগান। একসাথে আনারস, পেঁপে, কচু, মুখিকচু, চিনকচু, মরিচ লাগিয়েছেন। ইতিমধ্যেই তিনি কয়েক লক্ষ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। এভাবে মধুপুর গড় এলাকায় একই পদ্ধতিতে অনেক কৃষক ফসল চাষে ঝুঁকেছেন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, মধুপুর গড় এলাকার মাটি আনারস, কলা, পেঁপে, আদা, কচু, হলুদসহ নানা কৃষি ফসল চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। বন্যায় পানি উঠেনা। উচু লাল মাটিতে ফসল ফলন ভাল হয়। অনুকুল আবহওয়া বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার তারা এ পদ্ধতির ফসলে ভাল লাভ পাবেন এমনটাই তাদের আশা। কৃষকদের উৎপাদিত কাঁচামাল বিক্রির জন্য রয়েছে জলছত্র কাঁচামালের বাজার। এই বাজারে সারা বছর কৃষি পণ্য ক্রয় বিক্রয় হয়।

সারা দেশের সাথে ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল থাকার কারণে সহজেই সড়ক পথে কৃষি পণ্য দেশের নানা জেলায় পরিবহন করা যায়। এ জন্য ক্রেতারও কোন অভাব নেই। আবার বাগান থেকেও পাইকাররা কৃষকদের উৎপাদিত কাঁচামাল কিনে থাকেন। বাগান থেকে গাড়ি ভর্তি করে কৃষি ফসল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সমাগম হয়। অতিসহজেই কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষি ফসল বিক্রি করতে পারে। দাম কম বেশি যায় হোক ফসল বিক্রি নিয়ে তাদের কোন চিন্তা করতে হয় না।

এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, শুধু আনারস চাষে কৃষকদের লাভ কম হতো। কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগীতা দিয়ে এ চাষে উৎসাহিত করছি।

এখন আনারস বাগানে এক সাথে মাল্টা, আদা, পেঁপে, কচু, হলুদ, লেবু, মরিচসহ নানা কৃষি ফসল চাষ করছে। এটা একটা ইতিবাচক মিশ্র ফসল চাষ পদ্ধতি। এ পদ্ধতির চাষের ফলে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই পোর্টালের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্ব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design BY NewsTheme
error: Content is protected !!